Uncategorized

শিবরাত্রি নিয়ে কিছু কথা

12792105_359287990908558_3859020956682774295_o.jpgআমি শিবরাত্রি করিনা। এখন নাহয় সম্পূর্ণরকম নাস্তিক হয়ে গেছি, যখন আস্তিক ছিলাম, মানে আজ থেকে প্রায় বারো তেরো বছর আগে তখনও করতাম না। কারণ কিছু না, সিম্পল – শিবকে আমার ভালো লাগতনা। যেমন দুর্গাকে ভালো লাগত, কালীকে ভালো লাগত, সরস্বতী লক্ষ্মী নারায়ণ ব্রহ্মা ইত্যাদিকে ভালো লাগত, শিবকে না। কৃষ্ণকেও না। কৃষ্ণের কথায় অহেতুক যাচ্ছিনা কারণ টপিক এখানে শিব। তো, দেখতাম ছোটবেলায় যে মেয়েরাই মূলত শিবরাত্রি করে। মানে উপোষ করা, সাতসকালে স্নান করে শিবের মাথায় জল দেওয়া, দুধ ঢালা ইত্যাদি একগাদা রিচুয়াল। কারণ কি ? এসব করলে নাকি শিবের মতো বর পাওয়া যায়। আমাদের বাড়িতে ছিল পুরাণ টাইপের একটা ইয়া মোটা বই। তার কল্যাণে প্রায় বালিকা বয়স থেকেই পুরাণ এবং যাবতীয় দেবদেবীর ব্যাপারে কিছু কিছু জানার সৌভাগ্য হয়েছিল। সবটা বুঝতাম না, কিন্তু বেসিক আইডিয়া হয়ে গেছিল। আর ঠিক সেজন্যই শিবের মতো কেউ আমার বর হোক একদম চাইতাম না। সে ঠাকুর তো শশ্মানে ঘোরেন। মাঠেঘাটে ভাং খেয়ে পড়ে থাকেন। মাথার চুলগুলো জন্মে আঁচড়াননা। জামাকাপড়ও যেটুকু না পড়লেই নয়। তাঁর থেকে কৃষ্ণ বা কার্তিককে মাচ্ বেটার লাগত। দেখতে শুনতে ভালো। একজন ঝিনচ্যাক বাঁশি বাজান তো আরেকজন ফুলটু ফ্যাশন কনশাস। একেক দুর্গাপূজো প্যান্ডেলে একেক রকম ধুতি পড়ে পোজ মারেন। তো যাই হোক, কৃষ্ণরাত্রি বা কার্তিকরাত্রি কাউকে সেলিব্রেট করতে দেখতামনা। মনে মনে ভাবতাম মেয়েগুলো কি চোখের মাথা খেয়ে বসে আছে নাকি ? বড় হয়ে অবশ্য শিবের আরেক দিক নিয়েও অবাক লাগত। দুগ্গা ঠাকুর তো বরাবরই দেখি ছেলেপুলে নিয়ে একলা একলা বাপের বাড়ি যান। তাও বছরে একবার। সেখানেও শুধু চারদিনের জন্য। কোন বিবাহিতা বা বিবাহে ইচ্ছুক তরুণী আছেন নাকি এমন যাঁরা চান তাঁদের এমন বর হোক যে তাঁদের বাপের বাড়ি কখনও যাবেননা ? এবং, তাঁদের অনুপস্হিতিতে বন্ধুবান্ধব (aka নন্দী ভৃঙ্গী) জুটিয়ে কর্মস্হলে না গিয়ে আদাড়ে বাদাড়ে পড়ে থাকবেন ?

এখানেই শেষ না। শিব সারা পৃথিবীকে বিষমুক্ত করতে হলাহল পান করেছিলেন। সেই প্রচণ্ড বিষের তেজ থেকে তাঁর গলার রঙ নীল, যেজন্য তাঁর আরেক নাম নীলকন্ঠ। সেই সমান্তরালে আজকের কোন পুরুষকে যদি রাখি তাহলে এমন কোন মহিলা দেখেছি বলে তো মনে পড়ছেনা যিনি চাইবেন তাঁর বর বা বয়ফ্রেন্ড সমাজের কল্যাণে সমস্ত টাকাপয়সা বিলিয়ে দিক বা বৃহত্তর জনস্বার্থে নিজের প্রাণত্যাগ করুক।

শেষ করছি একটা রেফারেন্স দিয়ে। একজন বয়স্কা আত্মীয়া যাঁর খুব ঈশ্বরভক্তি আছে তাঁর সাথে একবার একটা মন্দিরে গেছিলাম। সেটা কালীবাড়ি। পাশে শিবলিঙ্গও আছে। আমাদের হাতে জলের ঘটী, ফুল, বেলপাতা। সামনে একজন মহিলা। মুখ দেখতে পাচ্ছিনা। পেছন থেকে দেখছি খুব আঁটোসাঁটো স্বল্পদৈর্ঘ্য পোশাক। হঠাৎ তিনি আমাদের দিকে ফিরে একটু ফুল চাইলেন। দেখলাম সেই প্রচণ্ড গরমের দুপুরে তাঁর উৎকট লাল লিপস্টিক, ভয়ংকর চড়া মেকআপ যা নিমেষে আমাদের বুঝিয়ে দিল তাঁর ‘জীবিকা’ একটু অন্যরকম। আমার সাথের বয়স্কা আত্মীয়া ততক্ষণে নাকমুখ কুঁচকোতে শুরু করেছেন। ফুল তাঁরই হাতে। তাই ঢাকার চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রাণপণে। বললেন, আমাদের কাছে ফুল নেই। আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ়, কারণ আমি বয়সে এবং সম্পর্কে ওনার থেকে ছোট। বড়দের মুখে মুখে নাকি কথা বলতে নেই। উৎকট সাজ ছোট পোশাক মহিলা মাথা নীচু করে চলে গেলেন পূজো অর্ধসমাপ্ত রেখে। আমরা নির্বিঘ্নে পূজো দিলাম অনেক ফুল দিয়ে। শিবের মাথায় জলও ঢাললাম। আমার আত্মীয়া খুব খুশী। অনেকদিন পর নাকি শান্তি করে শিবপূজো করতে পেরেছেন, ভাগ্যিস ঐ মেয়েমানুষটা আর ফেরেনি মন্দির দূষিত করতে। আমার মনে তখন খালি সেই মহিলার মাথা নীচু করে চলে যাওয়া। এটা বুঝে চলে যাওয়া যে তিনি ব্রাত্য।

শিবলিঙ্গ চুপচাপ দেখল। কিচ্ছু বললনা। আমাদের দেওয়া ‘শুদ্ধ’ ফুলগুলো ছুঁড়ে ফেলে পর্যন্ত দিলনা।

Advertisements
Standard

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s